Latest From My Blog

Showing posts with label নৃসিংহপ্রসাদ ভাদুড়ী. Show all posts
Showing posts with label নৃসিংহপ্রসাদ ভাদুড়ী. Show all posts

কথা অমৃতসমান

কথা অমৃতসমান
লেখক: নৃসিংহপ্রসাদ ভাদুড়ী কথা

ধর্মে চার্থে চ কামে চ মোক্ষে চ ভরতর্ষভ। 
যদিহাস্তি তদন্যত্র যন্নোহাস্তি ন কুত্রচিৎ। 
ধর্মশাস্ত্র বলুন কিংবা অর্থশাস্ত্রি বলুন, কামশাস্ত্রই বলুন অথবা মুক্তির শাস্ত্রই বলুন - যা এই মহাভারতে আছে, তা অন্যত্রও আছে; আর যা এখানে নেই, তা অন্য কোথাও নেই।

ডাউনলোড: পিডিএফ, ইপাব, মুবি

দেবতার মানবায়ণ

দেবতার মানবায়ন
(শাস্ত্রে সাহিত্যে এবং কৌতুকে)
লেখক: নৃসিংহপ্রসাদ ভাদুড়ী
দেবতাকে প্রিয় এবং প্রিয়কে দেবতা করে তোলার প্রয়াস বৈষ্ণব কবিদের রচনার অন্যতম বৈশিষ্ট্য, সন্দেহ নেই। কিন্তু এ-বিষয়ে তাঁরাই অগ্রপথিক কিনা তা নিয়ে সংশয়ের অবকাশ রয়েছে। নৃসিংহপ্রসাদ ভাদুড়ী তাঁর এই গ্রন্থে অতি মনোগ্রাহী এক আলোচনার মধ্য দিয়ে দেখিয়েছেন যে, এই প্রবণতার পিছনে রয়েছে সুদীর্ঘ এক পরম্পরা। বেদ-পুরাণ এবং কবি-মহাকবিদের নানান কাব্যকীর্তির মধ্য থেকেই জন্ম নিয়েছে দেবতার মানবায়নের এই পরম্পরা।
শুধু দেবতারাই বা কেন, অসুর, রাক্ষস, মহাপুরুষ—সকলেই অন্তর্ভুক্ত এই পরম্পরায়। মানুষের নানা অবস্থার কথা বোঝাতে গিয়ে আমরা যে ব্যবহার করি ‘গোবর-গণেশ’, ‘হাঁদা গঙ্গারাম’, ‘কলির কেষ্ট’, বা ‘ন্যাকা চৈতন্য’ জাতীয় বিবিধ বিশেষণ, উৎস খুঁজলে দেখা যাবে যে, এ-সবও সেই পরম্পরারই এক অঙ্গ।
সংস্কৃত শাস্ত্র, সাহিত্য ও লৌকিক প্রবাদের মধ্যে এই পরম্পরা কীভাবে গড়ে উঠেছে এবং কীভাবে ঘটেছে তার বিস্তার — তাই নিয়েই সুদীর্ঘ ও সারবান আলোচনা গ্রন্থ। দার্শনিক দিক থেকেও লেখকের প্রতিপাদ্যের এক পরম প্রতিষ্ঠা এখানে।
কীভাবে প্রিয় দেবতাকে সখা ও পিতার মতো পেয়েছি আমরা, নিয়ন্তার দুরত্ব ঘুচিয়ে প্রিয়ত্বের সীমারেখার বিস্তৃতর গণ্ডিতে কীভাবে ধরা পড়েছেন দেবতারা—বিশেষত বৈদিকত্তোর যুগের দেবতারা, কীভাবে তাদের দেবত্বকে ঘুলিয়ে দিয়েছি আমরা, তিরস্কৃত করেছি বিপরীত কার্য-কলাপের জন্য, চরম রঙ্গ-রসিকতার মধ্য দিয়ে দেখিয়েছি তাদের স্খলন-পতন-ত্রুটিগুলিকে, আবার কীভাবে স্থাপন করেছি যথাযোগ্য পূজ্য আসনে—সমূহ সংস্কৃত শাস্ত্র ও সাহিত্য মন্থন করে, লোকায়ত প্রবাদের ভাণ্ডার হাতড়ে তারই চমকপ্রদ বিবরণ এই বইতে শুনিয়েছেন নৃসিংহপ্রসাদ।
তাঁর বলার ভঙ্গিটি আদ্যন্ত অন্তরঙ্গ, শাস্ত্র ও সাহিত্যের গল্প ও ব্যাখ্যা শোনান অতি সরস ও স্বাদু ভাষায়, কিন্তু বিচার-বিশ্লেষণ ও প্রতিপাদ্যের ক্ষেত্রে কোনও লঘুতাকে প্রশ্রয় দেননি নৃসিংহপ্রসাদ ভাদুড়ী।
পড়ুন: পিডিএফ, ইপাব, মুবি



মহাভারতের ভারতযুদ্ধ এবং কৃষ্ণ

মহাভারতের ভারতযুদ্ধ এবং কৃষ্ণ
লেখক : নৃসিংহপ্রসাদ ভাদুড়ী
বিষয়: মহাভারতের গবেষণা বিষয়ক প্রবন্ধ
সে যুগে যা ধর্ম বলে প্রচলিত ছিল—বেদ-ব্ৰাহ্মণ্য ইত্যাদি, সেগুলির প্রতি অত্যন্ত সহানুভূতিশীল থাকার ফলে আপাতত গো-ব্ৰাহ্মণের হিতকারী এক বেদধর্মের প্রবক্তা হিসেবেই তাঁর সুনাম হয়েছিল । কিন্তু জীবনের ধর্মে তাঁর কঠিন বিরোধীদের তিনি যে পন্থায় স্বধামে পৌঁছে দিয়েছেন, ব্যাস তা লুকোননি। ব্যাস তাঁর অতি পরিশীলিত ব্যঞ্জনায় বুঝিয়ে দিয়েছেন, কিভাবে যুধিষ্ঠিরকে তিনি হাতের পুতুলে পরিণত করেছিলেন। গল্প শোনা যায়, এক সময়ে রাশিয়ার অভিভাবক স্টালিন নাকি হাতে কলমে দেখিয়েছিলেন যে প্রতিরোধ এলে কেমন ব্যবহার করতে হয়। তিনি একটি জ্যান্ত মুরগীকে সমস্ত পালক ছাড়িয়ে রাস্তায় ছেড়ে দিয়েছিলেন। গরম কিংবা ঠাণ্ডার হাত থেকে বাঁচবার জন্য মুরগীটি ক্ৰমাগত দেয়ালের কাছে সিঁটিয়ে যাচ্ছিল অথবা আশ্রয় নিতে চাইছিল দেয়ালের পাশে। যুধিষ্ঠিরের অবস্থােটা প্ৰায় ছিল এই মুরগীর মতন। যুধিষ্ঠির যদিও কৃষ্ণের বিরোধী ছিলেন না, কিন্তু কৃষ্ণের রাজনৈতিক ধুরন্ধরতায় যুধিষ্ঠির অথবা অন্য পাণ্ডবদের অবস্থা এমনই হয়েছিল যে, কোন ক্ষেত্রেই তাঁরা কৃষ্ণের মত বিরাট এক ব্যক্তিত্বের দেয়ালের পাশে না দাঁড়িয়ে পারছিলেন না। এ জিনিসটা ব্যাস আকারে প্রকারে, ব্যঞ্জনায় নানাভাবেই প্রকাশ করেছেন, ধৈর্যশীল মহাভারতের পাঠকের কাছে এর ব্যাখ্যা নিম্প্রয়োজন।
পড়ুন: পিডিএফ, ইপাব, মুবি

বাল্মীকির রাম ও রামায়ণ



নাম: বাল্মীকির রাম ও রামায়ণ
লেখক: নৃসিংহ প্রসাদ ভাদুড়ী
ধরণ: গবেষণামূলক, প্রবন্ধ
বিষয়: ভারতীয় ধর্মতত্ব, রামায়ণ
ফাইল: পিডিএফ, ইপাব, মুবি
রিভিউ: এটি রামায়ণ সম্পর্কে একটি বিশ্লেষণমূলক বই। বইটির প্রথম অংশটি রামায়ণের বিভিন্ন আঞ্চলিক সংস্করণের সাথে মূল রামায়ণের তুলনা। লেখক দেখিয়েছেন যে, বাল্মিকী কীভাবে একজন রামকে মানুষ হিসেবে উপস্থাপন করেছেন, এবং দেখিয়েছেন যে, রাম সময়ে সময়ে নিষ্ঠুর, ঈর্ষান্বিত, উদাসীন এবং রাগান্বিত ছিলেন। কিন্তু যখন তুলসিদাস বা কৃত্তিবাসের মতো অন্যান্যরা তাদের নিজ ভাষায় রামায়ণের সংস্করণটি লিখেছিলেন, তখন তারা রামের সমস্ত মানবসত্বাকে চরিত্রের বাইরে নিয়ে গিয়ে 'ঈশ্বর' বানিয়েছিলেন। বাল্মিকির অন্যান্য চরিত্রের সাথেও একই ঘটনা ঘটেছে। তারা সবাই মানুষ ও রক্ত মাংসের মানুষ ছিল, তাদের রাগ এবং আত্মবিশ্বাস ছিল। কিন্তু অন্যান্য সংস্করণগুলি এই বিভাগগুলি সম্পর্কে আলোচনা এড়িয়ে যায় এবং তাদের উপর 'ঐশ্বরিক' গুণাবলি প্রয়োগ করে। আমি বিশেষ করে ভাদুড়ীর আলোচনা পদ্ধতি পছন্দ করেছি। তিনি দেখিয়েছেন যে, কিভাবে আঞ্চলিক কবিগণ নিজ নিজ দৃষ্টিভঙ্গী থেকে বেরিয়ে এসেছেন এবং বঙ্গীয় হিন্দু ও অন্যান্যদের মতো সমস্ত রীতিনীতিগুলি সিদ্ধ করেছেন। 
দ্বিতীয় অংশটি খুবই একাডেমিক, এটি একাডেমিক আর্গুমেন্টগুলি নিয়ে আলোচনা করে যা কিছু পশ্চিমা গবেষকরা রামায়ণের বিষয়ে উত্থাপন করেছিলেন এবং লেখার ধরন এবং শব্দ ব্যবহারের উপর ভিত্তি করে, কীভাবে তারা রামায়ণ থেকে 'বালকাণ্ড' এবং 'উত্তরকাণ্ড' অংশকে উপেক্ষা করেছেন। ভাদুড়ী যুক্তি দেন যে, কোন অংশটি অন্তর্ভুক্ত করে এবং কোন অংশটি অন্তর্ভুক্ত না করে সিদ্ধান্ত নেওয়া সঠিক উপায় নয়। বরং এই পদ্ধতি বাল্মিকীর রামায়ণ বা রাম চরিত্রের বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়ার একটি অগভীর পরিমাপন।
সর্বোপরি, নৃসিংহ প্রসাদ ভাদুড়ীর 'বাল্মীমিক রাম ও রামায়ণ সামগ্রিকভাবে আমার পছন্দ হয়েছে, আপনিও পড়ে দেখুন, পছন্দ না হয়ে যাবে না।

কলিযুগ


গ্রন্থের নাম: কলিযুগ
লেখক: নৃসিংহ প্রসাদ ভাদুড়ী
শ্রেণী: গবেষণামূলক, প্রবন্ধ
বিষয়: ভারতীয় ধর্মতত্ব
ভাষা: বাংলা
ফাইল:  পিডিএফ, ইপাবমুবি

কৃষ্ণা কুন্তী কৌন্তেয়

কৃষ্ণা কুন্তী কৌন্তেয়
লেখক: নৃসিংহ প্রসাদ ভাদুড়ী
বিষয়: গবেষণা, প্রবন্ধ, মহাভারত
কথামুখ: যা ভেবেছিলাম, তা করা গেল না। আসলে শব্দের মধ্যে সাংঘাতিক শক্তি লুকোনো থাকে। তার মধ্যে যদি আবার সেই শব্দ ব্যবহার করেন ঋষিকল্প মহাকবি তা হলে শব্দ এমনই এক অপরিবর্তনীয় মাত্রা বহন করে যে, আমাদের মতো সাধারণ জনের বিপদ ঘটে সেখানেই। কবি-ঋষি ‘কর্ণ-কুন্তী সংবাদ’ রচনা করে এমনই এক মধুরতা বর্ষণ করেছেন আমার শ্রুতিপুটে যে, এই গ্রন্থের অন্তর্গত চরিত্রগুলির অন্বয়ে প্রথমে কুন্তীকে রেখে তারপরেই কর্ণের অবস্থান ঘটাব ভেবেছিলাম। কিন্তু তা করা গেল না। করা গেল না এই কারণে যে, কর্ণকুন্তীর জ্যেষ্ঠ পুত্র হওয়া সত্ত্বেও কর্ণ তাঁর অন্যান্য ভাইদের বিপরীত কোটিতে অবস্থান করছিলেন বলে তাঁর স্বভাব-চরিত্র, সংস্কার এবং ভাবনা এতটাই অন্যরকম যে, তাঁকে অন্য তিন কুন্তীপুত্রের অগ্রভাগে রাখতে পারিনি। 
অথচ কর্ণের মধ্যে সেই সম্ভাবনা ছিল। তিনি প্রথম কৌন্তেয় হতে পারতেন, তিনি পাঁচ পাণ্ডব-ভাইয়ের জ্যেষ্ঠতম হতে পারতেন, সব চেয়ে বড় কথা, তিনি দ্ৰৌপদীর প্রথমতম স্বামীও হতে পারতেন। সর্বস্তরে এই ‘হতে-পারতেন’ মানুষটা যেহেতু কখনই যা হবার ছিল তা হননি, তাই তাঁকে সবার শেষে রাখলাম বীরোচিত একাকিত্বের মর্যাদায়। 
গ্রন্থনামের মধ্যে আমি কোথাও পাণ্ডব কথাটা রাখব বলে ভেবেছিলাম। কিন্তু এও ভেবে দেখলাম—পঞ্চ পাণ্ডবের জীবনের মধ্যে এই রাজনাম অথবা বংশ নাম বহন করা ছাড়া পাণ্ডুর আর কোনও তাৎপর্য নেই। বরঞ্চ কুন্তীর প্রভাব এখানে অনেক বেশি। তা ছাড়া গ্রন্থনামের মধ্যে পাণ্ডব কথাটা থাকলে আমরা কোনওভাবেই এখানে কর্ণের প্রবেশ ঘটাতে পারতাম? অথচ কৰ্ণ বড় বেশি কৌন্তেয়। কুন্তী মনে মনে তাঁকে চিরকাল কৌন্তেয় বলেই মনে করেছেন। কর্ণও সারা জীবন ধরে সেই নেতি নেতি জননীর জন্য হা-হুতাশ করে নেতিবাচক ভাবেই কৌন্তেয়। 
আরও একটা কথা এখানে আগেই বলে নেওয়া ভাল। অতি শৈশবে জননীর দ্বারা পরিত্যক্ত হয়ে নিঃসীম হতাশার মধ্যে জীবন কাটিয়ে শেষ পর্যন্ত কৰ্ণ যেভাবে মৃত্যু-বরণ করেছেন, তাতে এই অসাধারণ বীরের জন্য আমাদের হৃদয়ে গভীর সমবেদনা আছে। কর্ণের জীবনের বিভিন্ন কঠিন মুহুর্তগুলি মহাভারতের কবি এমনই সকরুণভাবে বর্ণনা করেছেন যে, আমাদের এই হাহাকার জাগ্রত হওয়া অতি স্বাভাবিক। কিন্তু পরবর্তীকালের সংস্কৃত নাট্যকারেরা তথা মধ্যযুগীয় কাশীরাম দাশ এবং আমাদের মধ্যেও অন্য অনেকে কর্ণের প্রতি সমাজের বঞ্চনাটাকেই মাথায় বেশি রেখেছেন বলে করুণ রসটাকেই বড় করে ফেলেছেন। 
করুণ-রসটা যে এখানে বড়, সে ব্যাপারে আমারও কোনও সন্দেহ নেই। কিন্তু আমার বক্তব্য—সেই করুণার ধারাটি শুধু কর্ণের জীবনে নয়, এই ধারার উৎসটি খুঁজতে হবে তাঁর জননী কুন্তীর জীবন থেকে। অন্যদিকে মাতৃস্নেহ থেকে বঞ্চিত হওয়ার ফলে কর্ণের জীবনে যে সব বিকারগুলি ঘটেছিল, সেগুলি যেহেতু মহাভারতের কবি অত্যন্ত লোকসম্মতভাবে প্রকাশ করেছেন, তাই সেগুলিকেও আমি না দেখিয়ে পারিনি। তাতে কর্ণের সম্বন্ধে পাঠকের মনে যে চিরাচরিত মহান ধারণা আছে, তাতে কিছু আঘাতও লাগতে পারে হয়তো। কিন্তু মহাভারতের কবির সামগ্রিক দৃষ্টির কথা মনে রেখে সহৃদয় পাঠক সে আঘাত সইতেও পারবেন হয়তো। 
মহাভারতের চরিত্র বিশ্লেষণ বড় কঠিন কাজ। একেকটি চরিত্র একেকটি হীরক-খণ্ডের মতো। বিশেষত কর্ণের। বিশেষত কুন্তীর। বিশেষত যুধিষ্ঠিরের। এই হীরক-চরিত্রের কাঠিন্য ভেদ করা আমার সাধ্য ছিল না। আমার পূর্বজন্ম সাধক-মনীষীরা তাঁদের চেতনা-বজ্ৰাঘাতে এই সব কঠিন চরিত্রের অন্তর ভেদ করেছেন। আমি সেই ছিদ্রপথে সুতোর মতো প্রবেশ করেছি মাত্ৰ—মণৌ বজ্ৰ-সমুৎকীৰ্ণে সূত্রস্যেবাস্তু মে গতিঃ। 
কুন্তী কিংবা কৰ্ণচরিত্রের জটিলতা বাদ দিলেও যুধিষ্ঠিরের চরিত্র বোঝা মোটেই সহজ নয়। সাধারণ জনের মধ্যেই শুধু নয়, অনেক পরিপক্ক মানুষের মধ্যেও যুধিষ্ঠিরকে নিয়ে যখন আলোচনা হয়, তখন দেখি—যুধিষ্ঠিরকে তাঁরা ক্লীব, মেরুদণ্ডহীন, ঘটনার স্রোতে গা-ভাসানো এক নমনীয় ধার্মিক বলে প্রমাণ করার চেষ্টা করেন। আমি হলফ করে বলতে পারি—এঁরা মহাভারতের অন্তৰ্গত যুধিষ্ঠিরের চরিত্র কিছু বোঝেন না। যুধিষ্ঠিরকে বুঝতে হলে সেকালের সমাজকে বুঝতে হবে, ভারতবর্ষের দর্শনকে বুঝতে হবে, বুঝতে হবে নীতি যুক্তি ধর্ম, বুঝতে হবে—আবিল সংসারের মধ্যে থেকেও মানব-নীতির পূর্ণতায় পৌঁছনোর চেষ্টাকে। সেই চেষ্টার নামই যুধিষ্ঠির।
পার্থ-তৃতীয় অর্জুনকে আমরা মহাভারতের নায়ক বলে মনে করি এবং তিনিই পঞ্চপাণ্ডব-প্রিয়া দ্রৌপদীরও প্রিয়তম নায়ক। তাঁকে আমরা তাই দ্ৰৌপদীর অব্যবহিত পূর্বে রেখেছি। অবশ্য কৌন্তেয়দের অনুক্ৰমেও তাঁর ওই জায়গাতেই থাকবার কথা।
মহাভারতের সব চেয়ে খাপছাড়া চরিত্র হলেন ভীম। ভীম এমনই একজন মানুষ, যিনি মা, ভাই এবং তাঁর এক-পঞ্চমাংশের স্ত্রীটিকে পাগলের মতো ভালবাসেন। ভাইদের অনুক্ৰমেও তিনি মাঝখানে আছেন এবং আমাদের অনুক্ৰমেও তিনি মহাভারতের ছয় চরিত্রের মাঝখানে বসে তাঁর শক্তি এবং ভালবাসা একসঙ্গে বিকিরণ করছেন সবার ওপরে। 
আমরা আরম্ভ করেছি কুন্তীকে দিয়েই। কারণ তিনি চার পুত্রের গর্ভধারিণী জননী। গৰ্ভধারিণীকে আগে জানলে তাঁর পুত্রগুলিকেও বুঝতে সুবিধে হবে, বিশেষত কর্ণকে। জননীর পরিত্যক্ত বলে কর্ণের ওপরে, আমাদের যে মায়া আছে, সে মায়া থাকতে হবে কুন্তীর ওপরেও, কারণ ব্যক্তিগত জীবনে তিনিও কম দুঃখী নন, কম অভাগী নন। কর্ণ যদি সৰ্বকালীন পাঠকের করুণার আধার হন, তবে কুন্তীকেও সেই করুণ-রসের মাহাত্ম্যেই দেখতে হবে। সে জন্যও হয়তো দুই করুণ চরিত্রকে আমরা প্রথমে এবং শেষে রেখেছি। যাতে জননী এবং পুত্র দুই মেরুতে থাকা সত্ত্বেও তাঁদের অন্তৰ্গত চরিত্রের করুণ-রসটির সাজাত্য থাকে। 
মহাভারতে স্ত্রী-চরিত্রগুলির মধ্যে যে দীপ্তি আছে, সেই দীপ্তিতে সবচেয়ে উজ্জ্বল আমার কাছে কুন্তী এবং তাঁর পরেই দ্ৰৌপদী। পঞ্চস্বামীগর্বিতা দ্ৰৌপদীর জীবন বিভিন্ন মানবিক বৈচিত্র্যে বিশাল। তাঁর মতো আধুনিক এবং বিদগ্ধা রমণীর কল্পনা মহাভারতের কবি কীভাবে করেছিলেন তা ভাবতে গেলে শুধু অবাক হওয়া ছাড়া অন্য কোনও গতি থাকে না। কিন্তু দ্ৰৌপদীর এই বিশাল চরিত্রের চেয়েও আমার কাছে কুন্তীর চরিত্র আরও অনেক বেশি বর্ণময়, বৈচিত্র্যময়। একটি স্ত্রীলোকের জীবনে যে সব অনাকাঙিক্ষত জটিলতা থাকতে পারে, সেগুলি থাকা সত্ত্বেও নিজেকে একটি স্থির লক্ষ্যের দিকে নিয়ে যাওয়ার জন্য যে ব্যক্তিত্ব লাগে, যে রুচি লাগে এবং যে আত্মসচেতনতা লাগে—সেই ব্যক্তিত্ব, রুচি এবং মর্যাদার প্রতিরূপ হলেন কুন্তী। মহাভারতে কুন্তীর চরিত্র তাই দ্ৰৌপদীর চেয়েও বেশি মানবিক, অন্তত আমার কাছে তাই। 
ভূমিকা শেষ করার আগে আমার ইচ্ছাকৃত ত্রুটিগুলি সম্বন্ধে আগে মার্জনা চেয়ে নিই। উল্লেখ্য, এই গ্রন্থের অন্তর্গত প্রত্যেকটি চরিত্র পুজোসংখ্যা ‘বৰ্তমানে’ এক এক বছরে বেরিয়েছে। বিভিন্ন বছরে লিখবার সময়ে প্রত্যেকটি চরিত্রকে যেহেতু যথাসম্ভব সম্পূর্ণ রূপ দিতে হয়েছে, স্বাভাবিক কারণেই এখানে একত্রে সেই চরিত্রগুলি সংকলিত হওয়ায় কোনও কোনও জায়গায় পুনরুক্তি-দোষ ঘটে থাকবে। পুনরুক্তি না করেও যে প্রত্যেকটি চরিত্রের একক রূপ দেওয়া যেত না, তা নয়। কিন্তু তাতে প্ৰত্যেক চরিত্র মহাভারতের কবির হাতে আস্তে আস্তে কীভাবে বিবর্তিত হচ্ছে, তা দেখানো যেত না। সেই বিবর্তনের ধারাটি ব্যাহত হত। আমার পুনরুক্তি-দোষের সমর্থনে এর থেকে বেশি সাফাই আমি গাইব না, কারণ সুধীজন, এই গ্রন্থ পড়বার সময়েই আমার পুনরুক্তিগুলি উদারচিত্তে সমর্থন করবেন বলে আমি মনে করছি।
এই গ্ৰন্থ-প্রকাশে সহায়তা করার জন্য আনন্দ পাবলিশার্স-এর শ্ৰীদ্বিজেন্দ্রনাথ বসুকে আমার কৃতজ্ঞতা জানাই। এই গ্রন্থ প্রকাশের প্রাথমিক পর্যায়ে আমি কিছু সাহায্য পেয়েছি সংস্কৃত কলেজের কর্মী শ্ৰী অলোককুমার বিশ্বাস এবং আমার প্রিয় ছাত্র শ্ৰীপঙ্কজ দত্তর কাছে। এরা আমার আশীর্বাদের পাত্র। এই গ্ৰন্থ রচনার উৎসাহের সঙ্গে অজস্র গ্রন্থের সাহায্য দিয়ে আমায় ঋণী করেছেন আমার স্ত্রী শ্ৰীমতী সুষমা। আমার পুত্র অনির্বাণের প্রেরণাও এখানে কম নয়। গ্ৰন্থরচনার ক্ষেত্রে আরও যাঁরা উৎসাহ দিয়েছেন, তাঁদের সবার নাম করা এখানে সম্ভব নয়। তাঁদের সবার জন্য শুভেচ্ছা রইল। যিনি এই গ্রন্থের প্রচ্ছদ এঁকেছেন, তাঁকে আমি আমার অন্যতম বন্ধু বলেই মনে করি। এই প্ৰসন্ন প্রচ্ছদ সেই বন্ধুত্বেরই ফল। এই গ্রন্থের ‘সুসজ্জিত পত্রগুলি’ সম্পূর্ণ পড়ে যথাসম্ভব সংশোধন করে দিয়েছেন আমার বন্ধু এবং অধ্যাপক শ্ৰীপ্রবালকুমার সেন। আমার জন্য তিনি অনেক কিছুই করেন বলে কোনও কৃতজ্ঞতাই তাঁর জন্য যথেষ্ট নয়। এর পরে আমার কাম্য রইল শুধু সহৃদয় পাঠকের প্রশ্ৰয়।

ডাউনলোড: ইপাব, মুবি, পিডিএফ
+