গোরা - রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর


ডাউনলোড: Epub Or Mobi Or PDF


রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের তুমুল জনপ্রিয় ‘গোরা’ উপন্যাসের চরিত্রগুলোর একটু বিশ্লেষণ করার চেষ্টা করলাম এই লেখায়। জানি না কতোটা কি লিখতে পেরেছি। খুব কম সময়ের মধ্যে যা স্মরণ হচ্ছে তাই লিখতে শুরু করলাম—

কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বিখ্যাত ‘গোরা’ উপন্যাসের চরিত্রগুলো বড় অদ্ভূত! উপন্যাসের শুরুর কয়েকটি চরিত্র সম্পর্কে পড়ার পর মনে হবে যেন ‘মূল চরিত্র’ এর পরিচয় মিলছে। কিন্তু যতই ভেতরে প্রবেশ করতে থাকবেন বিস্মিত হবেন। পরের চরিত্রটিকেই বারবার মূল চরিত্র মনে হবে। অন্তত উপন্যাসের প্রায় অর্ধেকে পৌঁছে তবেই স্থির হওয়া যাবে যে, আসলে মূল চরিত্র কে বা কারা!

তবে একথা সত্য যে, কবিগুরু এই উপন্যাসের কোন চরিত্র ম্লান থাকেনি। কোন চরিত্রই অকারণ নয়। সব চরিত্রকেই অত্যন্ত দুর্ধর্ষ করে তুলেছেন তিনি। সব চরিত্রই নিজ নিজ জায়গা থেকে কি অসাধারণ, কি নির্মম, কি উজ্জ্বল, চাঞ্চল্য, নিস্পৃহ ভাবতেই শিহরিত হয়ে উঠতে হয়!

চরিত্র বিশ্লেষণ

‪গোরা‬ (উপন্যাস যার নামে তিনিই ‘গোরা’) — উপন্যাসের জন্য পুরোপুরিই স্বার্থক ‘গোরা’ চরিত্রটি! যেমন নাম তেমনই মূল চরিত্রটি। খালি চোখে আসলেই ‘গোরা’কে মনে হবে চরম ‘গোঁড়া’, পশ্চাৎপদ বা রক্ষণশীল তরুণ। সমাজের কুসংস্কার, জাত-জাতিভেদ প্রথাকে টিকিয়ে রাখতে যিনি সংগ্রাম করছেন! কিন্তু গভীরভাব গোরাকে ভাবতে গেলে বিস্ময়কর এক ভাবাদর্শ বেরিয়ে আসবে, যা আপনাকে শিহরিত করবে।

গোরা সবধরনের দু:খ-বেদনা,-ত্যাগ স্বীকার করে নিজেকে ভারতবর্ষের সন্তান হিসেবে দেখতে জানপ্রাণ বাজি রাখতে বদ্ধপরিকর! ভারতবর্ষে চলমান সকল ধর্মীয় আচার, কুসংস্কার, জাতিভেদ প্রথা সবকিছুই তার কাছে যেন স্বর্গীয় ব্যাপার! এসবকে তিনি তার দেশপ্রেম হিসেবে গণ্য করেন! তিনি ভারতবর্ষের প্রচলিত প্রথা-সংস্কৃতারগুলোর বিরোধীতা না করে ইংরেজ শাসনের অসংস্কৃতির মূলে আঘাত করতে চেয়েছেন। ইংরেজদের দু:শাসন মেনে নিয়ে যেসব ভারতীয় নিজেদেরেকে কৃত্রিমভাবে ইংরেজ চরিত্রের সঙ্গে মিলিয়ে নিতে চান, গোরা তাদের সঙ্গে তর্কে লিপ্ত হচ্ছেন বারবার। নীলকুঠিদের অত্যাচরে নির্যাতিত, নিষ্পেষিত মানুষের পক্ষে কথা বলতে গিয়ে তাকে জেল পর্যন্ত খাটতে হয়েছে! তিনি সরাসরি ম্যাজিস্ট্রেটকে হুমকি দিয়ে বসেছিলেন!

পরে জেনে অবাক হতে হয়, যে তরুণটি নিজেকে খাটি ভারতবর্ষের লোক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে পাগলের মতো ভারতবর্ষের এপাশ থেকে ওপাশ ঘুরে বেড়াচ্ছেন, গ্রামে গ্রামে মানুষের অগাধ শ্রদ্ধা অর্জন করছেন, মানুষের অধিকার আদায়ে, ভারতবর্ষের সংস্কৃতি, ধর্ম, নিয়ম-সংস্কার অক্ষুণ্ন রাখতে নিজের প্রাণের বন্ধু বিনয়কে পর্যন্ত অস্বীকার করছেন সেই মানুষটিই মূলত ভারতীয়ই নন! তিনি আসলে একজন আইরিশম্যানের সন্তান, যিনি ১৮৫৭সালের সিপাহী বিদ্রোহের সময় কৃষ্ণদয়াল-আনন্দময়ীর উঠানে আশ্রয় শিশু সন্তানকে রেখে মারা যান। তখন ‘গোরা’ শিশু সন্তান। কৃষ্ণদয়াল আর আনন্দময়ী ‘গোরা’কে সেখান থেকে উদ্ধার করে লালন-পালন করেন!

উপন্যাসের শেষের দিকে গোরা নিজের পরিচয় পেয়ে সম্পূর্ণ হতাশ হয়ে পড়েন! তিনি শেষের দিকে এসে সুচরিতার সান্নিধ্য চলে যান এবং পুরো উপন্যাসের প্রশান্তির জায়গা ‘পরেশবাবুর পায়ে গিয়ে লুঠিয়ে পড়েন’………(উপন্যাস সেখানেই শেষ হয়)

‎পরেশচন্দ্র‬ ভট্টাচার্য (পরেশবাবু)—এই মানুষটিকে পৃথিবীর কোন কুসংস্কারই স্পর্শ করতে পারেনি। তিনি সব-ধর্ম-জাতকে গ্রহণ করতে পারেন অবলিলায়, সীমাহীন উদার ব্যক্তিত্ব। গোরার মতো শক্ত মানুষও একসময় পরেশবাবুর পায়ে এসে লুঠিয়ে পড়তে বাধ্য হয়েছেন। এই চরিত্রটি যতোই পড়েছি ততোই হৃদয়ে প্রশান্তি অনুভূত হয়েছে। ললিতা-সুচরিতা, বিনয়, সতীশ সবাই যখন নিদারুণ কষ্ট, দু:খে, হতাশায় ডুবে যান তখন একটুখানি প্রশান্তির আশায় পরেশবাবুর কাছে আশ্রয় নিতেন। আর পরেশবাবুর কাছে আসলে যেন তাদের সকল দু:খ-বেদনা-দুর্দশা, হতাশা দূর হয়ে যেত। আমারও ঠিক তাই হয়েছে। বরদাসুন্দরী, হারানবাবু কিংবা গোরা’র চরিত্র পড়তে পড়তে যখন খুব বিরক্তি ঠেকছে মনে, ঠিক তখনই পরেশবাবুর কাছে এসেই প্রশান্তি অনুভব করতে পেরেছি। এমন মানুষের জন্যই পৃথিবীটা সুন্দর হয়ে থাকবে আজীবন। পৃথিবীতে বাস্তবে এমন উদারচিত্তের মানুষ পাব কিনা আমি জানি না! ‘গোরা’ উপন্যাসে এই পরেশবাবু চরিত্রটিকেই আমার মনে হয় হয়েছে ‘রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর যেন নিজের চরিত্রটাই পরেশবাবুর মাধ্যমে ফুটিয়ে তুলেছেন’!

‎সুচরিতা‬ — পরেশবাবুর পালিত কন্যা, অত্যন্ত শিক্ষিত, রূচিশীল তরুণী। তাকে পরেশবাবু নিজের মতো করেই গড়ে তোলার চেষ্টা করেছেন। অতীব ধৈর্যশীল, সহিষ্ণূ। কোন অতিকথন নেই, বাজে তর্ক-বিতর্কে সুচরিতা নেই। যা বলবেন এককথায়, যৌক্তিক! কিন্তু মাঝে মধ্যে সুচরিতার অতী ধৈর্য আমাকে খুব কষ্ট দিয়েছে, ক্ষুব্ধ করেছে, বিরক্ত করেছে! সুচরিতা দেখতে অপূর্ব রূপবতী। বিনয় যাকে প্রথম দেখায় অবাক হয়ে গিয়েছিলেন! শুরুতে আমি ভেবেছিলাম, বিনয় বোধয় একাকি জীবন থেকে মুক্তি পাচ্ছেন সুচরিতাকে দেখার পর! প্রথমে সুচরিতাকে বিনয়ের প্রেমিকাই মনে হয়েছে আমার। সত্যি বলতে কি, কবিগুরু প্রথম দিকে সুচরিতা চরিত্রটিকে সেদিকেই নিয়ে গিয়েছিলেন! কিন্তু পরে ঘটনা মোড় নেয় অন্যদিকে। ক্রমেই সুচরিতার মনে গোরার জন্য অনুরাগ জন্ম নিতে থাকে। সবশেষে সুচরিতা আর গোরা এক হয়েছিলেন। একসঙ্গে পরেশবাবুর পায়ে এসে লুঠিয়ে পড়ে নিজেরা নিজেদের করে নিয়েছিলেন!

‪ললিতা ‬– বিনয়ের প্রেমিকা, স্বাধীনচেতা তেজস্বী তরুণী। আঠার পেরোয়নি। তথাপিও কি পরিণত! কতোটা স্বাধীনচেতা! ললিতা দেখতে শ্যামবর্ণ, কিন্তু গায়ের রং দিয়ে ললিতাকে বিবেচনা করা যাবে না। শুরুর কয়েকটি পরিচ্ছেদে খুব বড় কোন ভূমিকায় ললিতাকে দেখা না গেলেও এই মেয়েটি পরে গিয়ে পুরো উপন্যাসকে প্রাঞ্চল করে তোলেন। ললিতা সমস্ত কুসংস্কারে যেমন কুঠারাঘাত করেছে তেমনি ইংরেজ ম্যাজিস্ট্রেটের অনুষ্ঠানে পারফরম্যান্স থেকে বিরত থেকে ইংরেজ বিরোধী মনোভাব স্পষ্ট করেছে!

ললিতা আর বিনয়ের প্রেম একসময় ধর্ম বাঁধা হয়ে দাঁড়ায়। বিনয় একজন খাটি হিঁদু, আর ললিতা ব্রাহ্মণ পরিবারের!! তথাপিও এদুজনকে কেউ দমিয়ে রাখতে পারেনি। ললিতার সাহসিকতায় এটা সম্ভব হয়েছে।

গোরা যেদিন জেলে গেলেন, সেদিন রাতেই ‘ম্যাজিস্ট্রেটের বাড়িতে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান করার কথা ছিল, যেখানে পারফরম্যান্স করার কথা বিনয়, ললিতা, সুচরিতা সহ অনেকের। কিন্তু যখনই ললিতা শুনতে পেলেন যে ম্যাজিস্ট্রেট গোরাকে অন্যায়ভাবে জেলে দিয়েছে। তখনই ‘ললিতা প্রতিবাদী হয়ে উঠেন!

যে মেয়ে ‘গোরা’কে প্রথম দিকে একজন মুর্খ, সংকীর্ণমনা লোক ভেবে অবহেলা করেছেন সেই ললিতাই ‘গোরা’র অকুণ্ঠ দেশপ্রেম,সাহস আর প্রতিবাদী ভূমিকাকে গুরুত্ব দিয়ে ম্যাজিস্ট্রের বাড়িতে অনুষ্ঠান না করে রাতেই বাড়ি ফিরে আসেন। তার সঙ্গ ছিলেন সে রাতে বিনয়। সেদিন বিনয়ও বন্ধুর এই পরিণতিতে ম্যাজিস্ট্রেটের বাড়ির অনুষ্ঠান না করে ফিরে এসেছিলেন। দু’জনই সারা রাত লঞ্চে করে কলিকাতার বাড়ি ফিরে আসেন।

সেই থেকে ললিতা-বিনয়ের গভীর প্রেম শুরু। তবে এর মধ্যে ঘটনা অনেক ঘটে যায়। রাতে বিনয় আর ললিতা একত্রে লঞ্চে করে কলিকাতায় আসা নিয়ে যখন ললিতার দুর্নাম রটে গেল তখন বিনয় ভিষণ কষ্ট অনুভূব করলেন। চারিদিকে ছড়িয়ে পড়ল যে, হিঁদু বিনয় আর ব্রাহ্মণ ঘরের ললিতার বিয়ে হতে চলেছে! অথচ বিনয় তার কিছুই জানেই না! বিনয় নিজেকে এর জন্য অপরাধী ভেবে এর প্রায়শ্চিত্ত করতে উঠেপড়ে লাগেন!

একসময় গিয়ে বিনয় সমস্ত বাঁধা তুচ্ছ করে ললিতাকে সামাজিক দুর্নাম থেকে বাঁচাতে চান, তার জন্য তিনি যেকোনো কিছুই করতে রাজি! এসময় বিনয়ের সামনে কঠিন বাস্তবতা চলে আসে। ললিতার মা বরদাসুন্দরী বিনয়কে স্পষ্ট জানিয়ে দেন, ব্রাহ্মণে দীক্ষা না নিলে ললিতাকে পাবে না বিনয়। একদিকে তার ললিতার প্রতি বিনয়ের গভীর প্রেম, অন্যদিকে সমাজের কঠিন বাস্তবতা-বিনয়মে বিচলিত করে তোলে! তবুও বিনয় সমাজের কথা ভুলে গেলেন, প্রেমের জন্য নিজের সব কিছু তুচ্ছ করে ললিতাকে পরিণয়ে আবদ্ধ করতে সমস্ত শর্ত মেনে নিলেন এবং ব্রাহ্মণ ধর্মে দীক্ষা গ্রহণে রাজি হলেন।

কিন্তু দু:সাহসী-তেজস্বী ললিতা বিনয়কে বাধা দিল। ললিতা একজন প্রকৃত বুদ্ধিমতির কাজ করলেন। প্রিয়তম বিনয়কে অসম্মান থেকে রক্ষা করলেন। ললিতা স্পষ্টই জানিয়ে দিলেন কোন দীক্ষা লাগবে না। আমার ধর্ম আমার, তেমাার ধর্ম তোমার। কিন্ত তুমি আর আমি মানুষ, আমরা একসাথে থাকব আজীবন’—–ললিতার এই ভূমিকা বিনয়কে বাঁচিয়ে দেয়। ললিতার প্রতি বিনয়ের শ্রদ্ধা বেড়ে গেল বহুগুণ! বিনয় ললিতার গুণে, জ্ঞানে মুগ্ধ হয়ে পারলে যেন পুঁজা করেন! গভীর পরিণয়ে আবদ্ধ হন দু’জন!

সত্যি, বিনয়-ললিতার মধ্যকার প্রেম আমাকে রোমান্সিত করে তোলে। বিনয় যেমন বিনয়ী, ললিতা তেমন দু:সাহসী। কিন্তু প্রিয়তম প্রেমিকের অসম্মান সে কোনভাবেই সহ্য করবে না! বাঙালি সমাজে এমন বিনয় যেমন বিরল, তেমনি এমন ললিতাও পাওয়া দুষ্কর! যদি এমন ললিতা পাই ‘বিশ্বাস করেন, আমি আজীবনের জন্য প্রেমে হাবুডুবু খাব তাঁর’!!

‪আনন্দময়ী‬ — উপন্যাস জুড়ে যে কয়েকটি চরিত্র আমাকে সবচেয়ে বেশি বিমুগ্ধ করেছে তার মধ্যে প্রথমত পরেশবাবু অন্যটি হলেন আনন্দময়ী! তিনি যেন ঠিক পরেশবাবুরই ফটোকপি। হিন্দু নারী, কিন্তু এমন উদার যে, জগতের সবকিছুকেই তিনি গ্রহণ করতে পারেন, প্রচণ্ড ভালোবাসা দিয়ে মানুষকে আপন করে নিতে পারেন, যিনি গোরা’র পালিত মা এবং কৃষ্ণদয়ালের স্ত্রী)।

এমন মা, এম নারী যদি বাংলার ঘরে ঘরে থাকত, তাহলে এই দেশ পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ সুন্দর দেশে পরিণত হতো নিশ্চিত বলতে পারি”।

বিনয়-ললিতার বিয়েতে যখন কেউ আসছে না। দু’ সমাজই যখন বিনয়-ললিতাকে ত্যাগ করলো তখন সানন্দে গ্রহণ করে বিনয়-ললিতার বিয়ে সম্পন্ন করেছিলেন এই আনন্দময়ী এবং পরেশবাবুই!

একটি স্বার্থক নাম অবশ্যই ‘আনন্দময়ী’। যেমন আনন্দময়ী, তেমনি স্বার্থকতা। সবাইকে তিনি আনন্দ দিতে পারেন। বিনয় হতাশ হয়ে তার পায়ে এসেই প্রশান্তি অনুভব করতেন! মূলত পুরো উপন্যাসজুড়ে সকল পাঠকমহলকে আনন্দে ডুবে রাখেন এই আনন্দময়ী!

‪কৃষ্ণদয়াল‬—(গোরার তথাকথিথ বাবা, আনন্দময়ীর স্বামী)- একটা নিস্কর্মা লোক। গোরাকে লালন-পালন করলেও তাকে কখনো গুরুত্ব দেননি! গোরাও কৃষ্ণদয়ালকে পাত্তা দেননি। তাই পাঠক হিসেবে আমিও তাকে এড়িয়ে গিয়েছি। একদম পাত্তাই দিইনি!! (হাহাহা)

‪মহিম‬—(গোরার আত্মীয়, ঠিক কি বুঝতে পারলাম না। আসলে তাকে বাজে একটা কীট মনে হয়েছে আমার! শালা একটা খাড়াস! শশিমুখী নামে ১১বছরের এক বালিকাকে জোরপূর্বক ‘বিনয়ের হাতে তুলে দিতে শালারপুত শালা কিনা করল!!, শশিমুখী মহিমের মেয়ে বোধহয়!) অথচ, বিনয় এই মেয়েটিকে কখনোই সেভাবে দেখেনি!! মহিমের এই আচরণ, তৎকালিন হিঁদু সমাজে নারীর প্রতি যে অবজ্ঞা তা ফুটে উঠেছে এবং বাল্য বিয়ের ঘৃণ্য দৃষ্টান্ত স্পষ্ট করেছে! আর ঘৃণ্য যৌতুক প্রথাকে সামনে এনেছে!

‪লাবন্য‬-লীলা—পরেশবাবুর তিন মেয়ে লীলা, লাবন্য এবং ললিতা। এরা ভালো ইংরেজি পাঠ করতে জানেন, ইংরেজি লেখাও অসাধারণ। তাদের মা বরদাসুন্দরী এদের প্রশংসা করতে করতেই দিন শেষ করে দেন)!

‪শ্রীসতীশচন্দ্র‬ মুখোপাধ্যায় (সতীশ)—সুচরিতার ছোট ভাই। বিনয়ের ক্ষুদে বন্ধু। কি যে চটপটে, উদ্যম এক শিশু বলার অপেক্ষা রাখে না। সতীশ আবার বিড়াল নাকি, কুত্তা পালে। সীমাহীন পণ্ডিত। বিনয়কে প্রচণ্ড ভালোবাসে সে! উপন্যাসজুড়ে সতীশের চটপটে চলাফেরা আমাকে বেশ আনন্দ দিয়েছে!

‪বরদাসুন্দরী‬– পরেশের স্ত্রী, বাজে একটা মহিলা, অত্যন্ত গোঁড়া, রক্ষণশীল। ইংরেজদের দালালি আর নিজের মেয়েদের প্রশংসায় ব্যস্ত থেকেছেন উপন্যাসজুড়ে! হারানবাবুর সঙ্গে এই বেটির যে ভাবসাব তাতে বেশ বিরক্তিকর ঠেকেছে আমার!

‪হারানবাবু‬– ব্রাহ্মণ সমাজের একজন প্রতিনিধি। নিজের একটি পত্রিকা আছে। পুরো উপন্যাসজুড়ে যে কজন খাড়াস আছে তাদের মধ্যে এই পাঁঠার পোলা পাঁঠা হচ্ছে প্রধান। সব জায়গায় খালি পিন মেরে গিয়েছে! একদিকে ইংরেজ ম্যাজিস্ট্রেটের দালালি অন্যদিকে সুচরিতাকে পাবার জন্য পাগলের মতো ঘুরেছে! শেষ পর্যন্ত সুচরিতাকে না পেয়ে পাগলা কুত্তার মতো এবাড়ি ঐ বাড়ি গিয়ে সুচরিতার দুর্নাম করেছে। শুধু কি তা-ই বিনয়-ললিতার নিখাদ প্রেমের দুর্নাম করে পত্রিকায় প্রবন্ধ ছাপিয়েছে এই খাড়াসটা! তার উপর আবার শেষ পর্যন্ত সুচরিতার পেছনে লেগেই ছিল! সুচরিতা স্পষ্টই না করে দেওয়ার পরও নির্লজ্জ হারান পেছনে কুকুরের মতো ঘুরত! খুব বিরক্তিকর একটা চরিত্র এটি! আমাকে একেবারে ক্ষুব্ধ করে তোলেছে! কবিগুরু পারেনও বটে!

‪হরিমোহনী‬– সুচরিতার দু:সম্পর্কীয় মাসী! এই বুড়িকে প্রথম দিকে ভালোই মনে হয়েছিল। সব হারিয়ে সুচরিতার কাছে এসে আশ্রয় নিয়েছিলেন তিনি। পরে নিজের আসল চেহারা প্রকাশ পায়। একেবারে বাজে হিন্দু বলতে যা বোঝায় তা-ই। ঠাকুর পুঁজা করে প্রথম দিকে বরদাসুন্দরীর পরিবারে অসহ্য হয়ে উঠলে পরে সুচরিতার নিজস্ব বাড়িতে গিয়ে সুচরিতা, সতীশ এবং হরিমোহনী একত্রে বসবাস শুরু করেন! সেখানে গিয়ে সুচরিতাকেও অসহ্য করে তোলেন এই বুড়ি! এর আগে নিজের মেয়ে মনোরমাকে একটি লম্পট ছেলের হাতে তুলে দিয়ে মেয়ের জীবন শেষ করে দিয়েছিলেন! পরে সুচরিতার কাছে এসে সুচরিতার বাড়িতে থেকে সুচরিতাকেই কিনা নানা বাঁধা-বিপত্তি দিতে শুরু করেন! একসময় এক চল্লিশ বছরের বুইড়া কৈলাসের সঙ্গে সুচরিতাকে বিয়ে দেয়ার জন্য বেশ উঠেপড়ে লাগেন! কিন্তু তাতে সম্ভব হয়নি। কারণ, সুচরিতা গোরার প্রেমে মত্ত!

‎মনোরমা‬—হরিমোহনীর কন্যা—-যিনি আজীবন স্বামীর দ্বারা নির্যাতিত হয়েছেন। যৌতুকপ্রথার বলি হয়েছেন। শেষে সন্তান প্রসবকালে মৃত্যুবরণ করেন!

‪#‎অবিনাশ‬– গোরার প্রধান ভক্ত, অনুচর। গোরা’র চামচাও বলা চলে। অবশ্য সেটা গোরার দোষ নয়। অবিনাশ নিজেই চামচামী করতেন! অতি উৎসাহী। কিছু না বলতেই করে বসেন। গোরার শত গালাগাল সত্ত্বেও হেসে উড়িয়ে দিতেন! অবিনাশের কাছ থেকে বর্তমান রাজনীতিক চামচাদের অনেক কিছুই শেখার আছে!!!

‎কৈলাস‬– হরিমোহনীর শ্বশুর বাড়ির আত্মীয়। বউ হারিয়ে একাকি ছিলেন। হরিমোহনী প্রায় চল্লিশ বছরের এই বুইড়ার হাতেই সুন্দরী সুচরিতাকে তুলে দিতে চেয়েছিলেন। বেটা সুচরিতার বাড়ি-ঘরের লোভে পড়ে এসে বেশ কিছুদিন অপেক্ষাও করেছেন! কিন্তু তাতে আর পেরে উঠেনি!!

‎সুধীর‬– পরেশের বাড়ির একজন। ঠিক কে বুঝতে পারিনি। তাই কিছু বললাম না!

এবার‬ বিনয়কে নিয়ে কয়েকটি কথা বলা যাক……………….

উপন্যাসটি শুরুই হয় বিনয়ভূষণ চট্টোপাধ্যায়ের পরিচয় দিয়ে। বিনয় পরিচয় যতোই পড়ি মনে হয় ঠিক যেন আমার বর্তমান অবস্থানকে আবিষ্কার করছি!

উপন্যাসের শুরুটা হয় এভাবে…………….শ্রাবণ মাসের সকালবেলায় মেঘ কাটিয়া গিয়া নির্মল রৌদ্রে কলিকাতার আকাশ ভরিয়া গিয়াছে। রাস্তায় গাড়িঘোড়ার বিরাম নাই, ফেরিওয়ালা অবিশ্রাম হাঁকিয়া চলিয়াছে, যাহারা আপিসের কালেজে আদালতে যাইবে তাহাদের জন্য বাসায় বাসায় মাছ-তরকারির চুপড়ি আসিয়াছে ও রান্নাঘরে উনান জ্বালাইবার ধোঁওয়া উঠিয়াছে-কিন্তু তবু এত বড়ো এই-যে কাজের শহর কঠিন হৃদয় কলিকাতা, ইহার শত শত রাস্তা এবং গলির ভিতর সোনার আলোকের ধারা আজ যেন একটা অপূর্ব যৌবনের প্রবাহ বহিয়া লইয়া চলিয়াছে”…….

….এমন দিনে বিনা-কাজের অবকাশে বিনয়ভূষণ তাহারা বাসার দোতলার বারান্দায় একলা দাঁড়াইয়া রাস্তায় জনতার চলাচল দেখিতেছিল। কালেজের পড়াও অনেকদিন চুকিয়া গেছে, অথচ সংসারের মধ্যেও প্রবেশ করে নাই, বিনয়ের অবস্থাটা এইরূপ। সভাসমিতি চালানো এবং খবরের কাগজ লেখায় মন দিয়াছে-কিন্তু তাহাতে সব মনটা ভরিয়া উঠে নাই….”

এরপর বিনয় ভাবনায় ডুবে যায়। নিজেকে খুব একলা-একাকি ভাবনা থেকে নশ্বর জীবনকে বড় অদ্ভূত ঠেকে তার কাছে। বিনয় হঠাৎ একটা বাউলের গান শুনতে পাইল ‘…….

‘খাঁচার ভিতর অচিন পাখি কমনে আসে যায়,
ধরতে পারলে মনোবেড়ি দিতেম পাখির পায়’….

বিনয়ের এমন একাকিত্ব, সেমি-বেকার জীবনকে যেন মাঝে মধ্যে আমার নিজের সাথে মিলিয়ে দেখছিলাম!

তার অনেকগুরো গুণের মধ্যে কিছু মানবিক গুণ রয়েছে যা যে কেউ ধারণ করতে পারবে না। পুরো উপন্যাসজুড়ে যতোবার বিনয় চরিত্রটি এসেছে আমি অত্যন্ত মনোযোগ তাকে পড়েছি। তার অনন্যাসাধারণ বিনয়, উদারতা, নম্রতা দেখে অবাক হয়েছি!

‘বিনয়’ নামটাই স্বার্থক করে তুলেছেন কবিগুরু। এতোটা উদার, এতোটা নম্র, মানুষকে আপন করে নেবার এমন গুণ আর কোন মানুষের থাকতে পারে তা আমি ভাবতেই পারিনে! বিনয়ের কাছে ধর্ম-বর্ণ-জাত বড় বিষয় নয়, বিনয় মানুষ হিসেবেই মানুষকে বিবেচনা করেন।

তার অন্য যেসব গুন সবাইকে মুগ্ধ করে তার মধ্যে তার অসাধারণ বাগ্মিতা অন্যতম। ইংরেজিতে বিনয় অসাধারণ বক্তৃতা দিতে পারেন। বাংলায় তো পারনেই। বিনয় খবরের কাগজে ইংরেজি-বাংলা দুটোই লিখেন এবং অসাধারণ লিখেন।

বিনয় একজন উচ্চশিক্ষিত যুবক। তার মা-বাবা কেউই নেই। গোরা’র মা আনন্দময়ীকেই বিনয় মা বলে ডাকেন। এই উদার, বড় মনের মহিলাটি বিনযকে তার নিজের সন্তানের চেয়ে বেশি ভালোবাসেন।

শুরুতে অবশ্য বিনয় চরিত্রটি আপনাকে বিরক্তি উপহার দেবে। যতক্ষণ না তিনি ‘গোরা’র বগলের নিচে নিজেকে আড়াল রাখেন ততোক্ষণ বিনয়কে মনে হবে যেন একজন ‘নিতান্ত দুর্বলচিত্রের যুবক তথা কাপুরুষ’! কিন্তু যেই না ‘গোরা’ থেকে বেরিয়ে আসছেন তখনই তাকে মনে হবে একজন মহাপুরুষ। ললিতার সঙ্গে ভাবসাব হবার পর থেকে বিনয় আরো বিকশিত হয়। নিজেকে বুঝতে পারেন। পৃথিবীকে নতুন করে আবিস্কার করেন…..

উপন্যাসটি বিনয় চরিত্রটি পড়ে মাঝে মধ্যেই আপনার নিজের সাথে তুলনা করবেন বিনয়কে! অন্তত কয়েক ঘণ্টার জন্য নিজেকে বিনয় চরিত্রে আবিষ্কার করবেন আপনি! যদিও জানি যে, বাস্তবে ‘বিনয়’ হয়ে উঠা অত সহজ নয়!

‘বিনয়’ অনেক বড় মাপের মানুষ, অনেক উদার যুবক……..

লেখক: সাইফুল্লাহ সাদেক
+